17/03/2026
ফাটল – কালের বিরুদ্ধে – এপিসোড ১
সময় ভ্রমণ কাহিনি

ফাটল – কালের বিরুদ্ধে – এপিসোড ১

Mar 17, 2026

গল্পের নাম : কালের বিরুদ্ধে
এপিসোড  : ফাটল

ধরন : বাংলা সায়েন্স ফিকশন থ্রিলার ।

২০৮৭ সাল – সিউল, কোরিয়া

আকাশটা আর এখন আর নীল নেই।

কিম জিউ জানালার দিকে তাকায়। বাইরে যতদূর চোখ যায়, শুধু কমলা-বাদামি ধোঁয়া। সূর্য উঠেছে কি না এখন আর বোঝার উপায় নেই – আলোটা ঠিক আলোর মতো না, অনেকটা জ্বলন্ত তামার মতো। নিচে শহরের যে অংশটুকু দেখা যায়, সেখানে ভাঙা দালানের ফাঁকে ফাঁকে সবুজ লতাপাতা উঠে এসেছে। একসময় এই পথে হাজার হাজার মানুষ হাঁটাচলা করতো । এখন তা দেখা যায় না।

জিউ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

সে এখন যে ঘরে দাঁড়িয়ে আছে, সেটা আসলে একটা গবেষণাগার (ল্যাবরেটরি)। চারদিকে কাচের দেয়াল, মাঝখানে বড় একটা হলোগ্রাফিক (আলোক-চিত্র) স্ক্রিন জ্বলছে নীল আলোয়। স্ক্রিনে লেখা: TEMPORAL FAULT DETECTED – 2047.11.14। অর্থাৎ, সময়ের একটি ফাটল বা ডোর ধরা পড়েছে – ২০৪৭ সালের ১৪ নভেম্বর।

জিউ স্ক্রিনের দিকে এগিয়ে যায়। তার বাঁ হাতে রুপালি রঙের একটা যন্ত্র – দেখতে ঘড়ির মতো, কিন্তু ঘড়ি নয়। এটা তার টাইম-কোয়ান্টাম ডিভাইস (সময়-কোয়ান্টাম যন্ত্র)। বছরের পর বছর ধরে সে এই যন্ত্র তৈরি করেছে।

“আবার দেখাচ্ছে,” জিউ বলে, প্রায় নিজের মনেই। “ঠিক একই তারিখ।”

পেছন থেকে একটা কণ্ঠ শোনা যায় – গম্ভীর, ঠান্ডা।

“জিউ। তুমি কি আবার ওই রিপোর্টটা পড়ছ?”

জিউ ঘুরে তাকায়। দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন সো-ইয়েল। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, রুপালি-সাদা চুল, চোখে এমন একটা দৃষ্টি যেন সবকিছু মাপছেন। তিনি এই গবেষণা বিভাগের (রিসার্চ ডিপার্টমেন্ট) প্রধান।

“হ্যাঁ,” জিউ সরাসরি উত্তর দেয়। “কারণ এখানে স্পষ্ট লেখা – ২০৪৭ সালের ১৪ নভেম্বর ঢাকায় যদি AI গবেষণাকেন্দ্রে একটা নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত না নেওয়া হতো, তাহলে আজকের এই পৃথিবী হতো না।”

সো-ইয়েল একটু চুপ থাকেন। তারপর বলেন, “তুমি জানো এটা কতটা বিপজ্জনক।”

“আমি জানি,” জিউ বলে। “কিন্তু আমি আরও জানি – কেউ কিছু না করলে ২০৯০ সালের মধ্যে পৃথিবীর বাকি ৪০ ভাগও শেষ হয়ে যাবে। তখন আর কোনো গবেষণাগার থাকবে না। থাকব না আমরাও।”

সো-ইয়েল কোনো জবাব দেন না। তিনি শুধু একবার জিউয়ের দিকে তাকান – সেই দৃষ্টিতে বারণের কিছু নেই, কিন্তু সতর্কতার ছায়া আছে। তারপর চলে যান।

জিউ আবার স্ক্রিনের দিকে ঘুরে তাকায়।

সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।

প্রথম লাফ – কোয়ান্টাম জাম্প

রাত তিনটা। পুরো ল্যাব ফাঁকা। জিউ তার ডিভাইসে তারিখ সেট করে: ২০৪৭.১১.১৪ – ঢাকা, বাংলাদেশ। সে গভীর শ্বাস নেয়। কোয়ান্টাম জাম্প (সময়-কোয়ান্টাম লাফ) মানে শুধু এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া নয় – এটা সময়ের একটা পাতলা চামড়া ভেদ করে অন্য একটা সময় চলে যাওয়া । প্রতিটা জাম্পে শরীরের উপর বড় রকম চাপ পড়ে। মাথার মধ্যে মনে হয় কেউ হাজারটা সুই ঢুকিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু জিউ অভ্যস্ত। সে বোতাম ক্লিক করে তখন মনে হয় পুরো পৃথিবীটা একবার কেঁপে ওঠে – তারপর সব কিছু নীল আলোয় ডুবে যায়।

২০৪৭ সাল – ঢাকা, বাংলাদেশ

গরম আনুভব করে এটাই জিউয়ের প্রথম অনুভূতি। সিউলের সেই কৃত্রিম ঠান্ডা হাওয়া এখানে নেই – ঢাকার নভেম্বরের রাত তবু গায়ে লাগে। জিউ একটা সরু গলির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে বাংলা লেখারয়েছে ও সাইন বোর্ড জ্বলছে। কোথাও চায়ের দোকান, কোথাও পুরনো রিকশার শব্দ – তারই পাশে ভেসে যাচ্ছে ইলেকট্রিক হোভার-ভ্যান।

২০৪৭-এর ঢাকা দুটো শহর একসাথে – পুরনো আর নতুন।

জিউ তার হুডি ঠিক করে নেয়। ডিভাইস এখন লুকানো হাতার নিচে। সে একটা হলোগ্রাফিক ম্যাপ বের করে – ছোট, হাতের মুঠোয় ধরা যায় এমন। লক্ষ্য: বুড়িগঙ্গা নদীর পাশে নতুন তৈরি হওয়া AI রিসার্চ সেন্টার (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাকেন্দ্র)।

“তুমি কি হারিয়ে গেছ?”

জিউ চমকে পেছনে ঘোরে।

একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে – বাংলাদেশি মেয়ে, বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে। উষ্ণ সোনালি-বাদামি রঙের ত্বক, বড় কৌতূহলী চোখ। চুল উঁচু করে বাঁধা, কিন্তু কয়েকটা গোছা এসে মুখ ঢেকেছে। হাতে একটা স্বচ্ছ ট্যাবলেট – তাতে সংখ্যার সারি।

মেয়েটা আবার বলে, “AI সেন্টারের ম্যাপ দেখছ মনে হচ্ছে। তুমি কি ওখানে যাবে?”

জিউ একটু থেমে বলে, “হ্যাঁ। তুমি চেন ওখানটা?”

মেয়েটা হাসে। “চিনব না মানে? আমি ওখানেই কাজ করি। নাদিয়া – ক্রিপ্টোগ্রাফি বিভাগ।” সে হাত বাড়িয়ে দেয়।

জিউ হাত মেলায়। “কিম জিউ। কোরিয়া থেকে।”

নাদিয়া ভ্রু তোলে। “কোরিয়া? একা একা এই গলিতে?”

“গবেষণার কাজে,” জিউ বলে, সংক্ষেপে। “কাল সকালে সেন্টারে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ম্যাপে কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে।”

নাদিয়া একটু হেসে বলে, “গণ্ডগোল আসলে তোমার না, ম্যাপের। এই পাড়ার পুরনো রাস্তাগুলো ম্যাপে ঠিকমতো আপডেট হয়নি। চলো, আমি দেখিয়ে দিই।”

রাতের ঢাকায় হাঁটা

দুজনে হাঁটছে। নাদিয়া কথা বলতে ভালোবাসে – সে বলে যাচ্ছে ঢাকার নতুন সোলার সড়ক নিয়ে, বুড়িগঙ্গায় ভাসমান সোলার ফার্ম নিয়ে। জিউ শুনছে, কিন্তু আসলে মাথার মধ্যে ঘুরছে একটাই প্রশ্ন – সেন্টারে কাল কী ঘটবে?

“তুমি AI গবেষণার কোন দিকে কাজ করো?” নাদিয়া জিজ্ঞেস করে।

জিউ একটু ভেবে বলে, “কোয়ান্টাম কম্পিউটিং আর টাইম-ডেটা অ্যানালিসিস।”

নাদিয়ার চোখ বড় হয়ে যায়। “টাইম-ডেটা? সেটা আবার কী?”

“মানে,” জিউ বলে, সাবধানে, “সময়ের সাথে ডেটার পরিবর্তন কীভাবে ঘটে – সেটা নিয়ে গবেষণা।”

নাদিয়া মাথা নাড়ে। “আমিও একটু ওরকম কাজ করি – এনক্রিপশন (গোপন সংকেত) কীভাবে সময়ের সাথে দুর্বল হয় বা শক্তিশালী হয়, সেটা নিয়ে।”

জিউ থমকে যায়।

এটা কি শুধু কাকতালীয়?

“কাল সেন্টারে তোমাদের কোনো বিশেষ মিটিং আছে?” জিউ স্বাভাবিক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে।

নাদিয়া হাঁটতে হাঁটতে বলে, “হ্যাঁ আসলে – একটা বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু…” সে থামে।

“কিন্তু কী?”

“আজ বিকেলে শুনলাম মিটিং বাতিল হয়েছে। সেন্টার কাল বন্ধ থাকবে। মেইন্টেন্যান্স (রক্ষণাবেক্ষণ) নাকি।”

জিউয়ের বুকের ভেতর একটা ধাক্কা লাগে।

বন্ধ থাকবে।

সে হাজার আলোকবর্ষ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে – কিন্তু ঠিক যেদিন সে এসেছে, সেদিনই সেন্টার বন্ধ।

রাতের শেষে

নাদিয়া জিউকে একটা ছোট হোটেলের সামনে পৌঁছে দেয়। যাওয়ার আগে বলে, “কাল সেন্টার খুলবে না। কিন্তু আমি সকালে যাব – কিছু ফাইল নিতে হবে। চাইলে আমার সাথে যেতে পারো।”

জিউ রাজি হয়।

নাদিয়া চলে যায়। জিউ হোটেলের ছোট ঘরে ঢুকে বিছানায় বসে। সে ডিভাইসটা বের করে তাকায় – স্ক্রিনে এখনো সেই তারিখটা জ্বলছে। ২০৪৭.১১.১৪।

সে কি ভুল দিনে এসেছে? নাকি সময় নিজেই তাকে ভুল করিয়েছে?

জিউ জানলার দিকে তাকায়। বাইরে ঢাকার রাত – কোলাহলে ভরা, জীবন্ত। এই শহর এখনো ভালো আছে। সবুজ আছে। মানুষ হাসছে। কিন্তু ৪০ বছর পরে – এই শহরই হবে দংশোযোগ যায়গা। যদি সে ব্যর্থ হয়। জিউ চোখ বন্ধ করে। কাল আবার চেষ্টা করতে হবে।

পরবর্তী পর্বে – এপিসোড ০২: লুপের প্রথম চিহ্ন

কাল সকালে নাদিয়ার সাথে সেন্টারে গিয়ে জিউ একটা অদ্ভুত জিনিস আবিষ্কার করে – সেখানে এমন কিছু চিহ্ন আছে যা মনে হয় সে নিজেই রেখে গেছে। কিন্তু সে তো আগে কখনো এখানে আসেনি! আর তারপর জিউকে যেতে হবে টোকিওতে – যেখানে তানাকা রেন নামের এক বিজ্ঞানী অপেক্ষা করছেন। রেন জানেন জিউ আসবে। কিন্তু সে কীভাবে জানলেন? সময়ের চক্র কি শুরু হয়ে গেছে আরও আগেই?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *